Thursday, 11 June 2020

লকডাউনের পর হাজার হাজার বাংলাদেশী বেকার মালয়েশিয়ায়।

এশিয়ার বৃহত্তম এবং আবহাওয়া উপযোগী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়ায় ​করোনা ভাইরাসে মোকাবেলায় লকডাউন শেষ হলেও বৈধ-অবৈধ মিলে বেকার হয়ে পড়েছে হাজার হাজার বাংলাদেশী। ১০ জুন থেকে মালয়েশিয়ায় ১১ টি ব্যাবসা বাণিজ্য বাদে সব চলছে আগের মত। কিন্তু দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা সেদেশের বিভিন্ন কল কারখানা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন, হোটেল, রেস্টুরেন্টের ব্যাবসায় চলছে মন্দাভাব।

যার কারনে বৈধ- অবৈধ হাজার হাজার বাংলাদেশীরা এখনো ছুটিতে অবস্থান করছে ঘরে। কোন রকম হাওলাত করে পার করছে দিন। করোনা ভাইরাসের কারণে গত ১৮ মার্চ থেকে টানা ৯ জুন পর্যন্ত চলে বিভিন্ন বিধিনিষেধ। সেই বিধিনিষেধ শেষ করে ১০ জুুন থেকে মালয়েশিয়ায় ফিরেছে আগের মত। কিন্তু সেদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ভাগ্যের চাকা কবে খুলবে তারা জানেনা কেউ। সেদেশের হোটেলগুলোতে কর্মরত বেশিরভাগ বাংলাদেশি বেকার হয়ে পড়েছে।

টুরিস্টদের কাছে জনপ্রিয় মালয়েশিয়ার হোটেল ব্যবসা চলছে ব্যাপক মন্দাভাব। সেদেশে এখনো বিদেশীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হোটেল গুলোতে পর্যটকদের আগমন না থাকায় কর্মরত বাংলাদেশীদের মানবতার জীবন যাপন করতে হচ্ছে। সবথেকে বড় ধরনের বেকারত্বমালয়েশিয়ার পাইকারি কাঁচাবাজার পাচার সেলাইয়াংয়ে। সেখানে কর্মরত কয়েক হাজার বাংলাদেশি আজ বেকারত্ব জীবনযাপন করছে। ঐ বাজারে বিদেশিদের কাজকর্মের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আজ ব্যবসা গুটিয়ে বাসাতেই অবস্থান করছেন।

এছাড়াও বিদেশি অভিবাসীদের শহর জহরবারু এবং পেনাংয়ের একই অবস্থা। বহু বাংলাদেশিরা বেকার হয়ে ঘরে অবস্থান করছে। তবে সব থেকে বেশি সমস্যায় রয়েছে এজেন্টের নামে ভিসা করে যারা বিভিন্ন জায়গায় দিন হিসাবে শ্রম বিক্রি করত তাদের। কারণে ওইসব কোম্পানিতে কর্মরত বাংলাদেশীরা মানবতার জীবন যাপন করছে।

এছাড়াও খরচ বাঁচাতে মালিকপক্ষ তাদের শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক ছুটি দিচ্ছে। এ ব্যাপারে কথা হয় পাহাংয়ের কুয়ান্তানে হোটেলে কর্মরত বাংলাদেশীদের সাথে। নারায়ণগঞ্জের হালিম এই প্রতিবেদককে জানায়, প্রায় তিন মাস ঘরে অবস্থান করার পর ভেবে ছিলাম ১০ জুন থেকে কাজে ফিরতে পারব। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না। দুই একজনকে কাজ দিয়ে কোনরকম হোটেল খুলে মালিক ব্যবসা পরিচালনা করছে। যার কারণে আমরা আবারও বেকার অবস্থায় রয়ে গেলাম।

বুধবার থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অধিকাংশ বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তঃরাজ্য ভ্রমণের ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে সরকার। সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে দেওয়া বিধিনিষেধও প্রত্যাহার হয়েছে। তবে আপাতত ১১ টি বিধিনিষেধ আরোপ আছে। বন্ধ থাকছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত। স্কুল খুলবে ২৪ জুন থেকে। এছাড়া পার্ক, নাইট ক্লাব, যেসব খেলায় খুব কাছাকাছি আসার প্রয়োজন হয় সেসব খেলা এবং অতিরিক্ত জনসমাগম হবে এমন বিনোদন কেন্দ্র আপাতত বন্ধ থাকবে। কঠোর লকডাউনে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসার পর গত মে মাস থেকেই দেশটির লকডাউন ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে।

গত ১৮ মার্চ থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্কুল বন্ধ। পাশাপাশি সব ধরনের জনসমাবেশ ও ভ্রমণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল এতদিন। তবে লকডাউন থাকা কালীন অবস্থায় ৭০ জন বাংলাদেশি একটি ঘরে রয়েছে অর্ধাহারে। সরেজমিন দেখা যায়, এমসিসি ইস্ট মালয়েশিয়া এসডি এন বিএইচডির সাপ্লাইয়ার কোম্পানির সেরি সারডাং গোডাউনে পড়ে রয়েছেন ভুক্তভোগী প্রায় ৭০ বাংলাদেশি কর্মী। তারা জানান, বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি ইউনিক ইস্টার্ন, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, কাতারসিস, সানজারিনের মাধ্যমে মালয়েশিয়া আসেন। মানুষের বসবাসের মতো ওই গোডাউনে নেই কোনো ব্যবস্থা। অপরিষ্কার ও নোঙরা পরিবেশ দেখলেই গা-শিউরে উঠবে। গাদাগাদি করে ৭০ বাংলাদেশি সেখানে রয়েছেন। সবার মুখে বিষণ্নতার ছাপ। কেউ ভয়ে কথা বলতে রাজি নন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বললেন, কী আর বলব ভাই। আপনি এসেছেন, কুশল বিনিময় করে চলে যান। সাপ্লাইয়ার কোম্পানির লোকজন রয়েছে। কিছু বললে আপনি যাওয়ার পরই আমাদের ওপর চলবে শারীরিক নির্যাতন। যারাই প্রতিবাদ করেছে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হয়েছে। প্রতিবাদ করায় কয়েকজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তারা কোথায় আছে, কেউ জানে না। এমনকি কোম্পানিও তাদের খোঁজ নেয় না। আমরা গোডাউনে পড়ে রয়েছি বেঁচে থাকার তাগিদে। এমন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে মালয়েশিয়া থেকে বিমান চলাচল শুরু হলে এসব বেকার অভিবাসীরা দেশে ফিরতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

মালয়েশিয়ার নামবিহীন কোম্পানিতে শত শত বাংলাদেশি এনে বেকার অবস্থা এবং মানবিক সংকটের কারণে আলোচনায় ছিল মালয়েশিয়া শ্রমবাজার। শুধু নতুন শ্রমিক রপ্তানিতে ছিলনা দুর্নীতি বরং সে দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের ২০০৬ সালে মালয়েশিয়া সরকারের বৈধ প্রকল্পে (রিহায়রিং) প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে বৈধতা না পেয়ে অবৈধ হয়ে পড়ে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি। বৈধতা না পাওয়া বাংলাদেশীদের জনপ্রতি খরচ হয়ে যায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা।এখনও একটি টিকিটের অপেক্ষায় ডিটেনশন ক্যাম্পে হাজার বাংলাদেশি অপেক্ষা করছে।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে জিটুজি (গভমেন্ট টু গভমেন্ট) পদ্ধতিতে কর্মী পাঠাতে চুক্তি করে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ। ওই প্রক্রিয়া সফল না হওয়ায় ২০১৬ সালে পাঁচটি খাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ে ‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতিতে কর্মী নিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে দুদেশ। পাঁচ বছর মেয়াদী এই চুক্তির আওতায় লোক পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয় ১০টি জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিকে।

কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার কারণে বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ করে দেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ।

শেয়ার করুন

0 Please Share a Your Opinion.: