Monday, 27 July 2020

যুবলীগ নেতাকে মাস্ক পড়তে বলায় পুলিশের সার্জেন্টকে গুলি করার চেষ্টা

রাজধানীর মিরপুরে জুয়েল রানা নামে এক যুবলীগ নেতাকে মাস্ক পরতে বলায় দলবল নিয়ে পিস্তল ঠেকিয় পুলিশের এক সার্জেন্টকে বেধরক মারধোরের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত জুয়েল রানা পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক।

ভুক্তভোগী পুলিশ সার্জেন্ট মো. আল ফরহাদ মোল্লা ২৭ জুলাই (সোমবার) সন্ধ্যায় জুয়েল রানাসহ অজ্ঞাত ৪০ জনকে আসামী করে পল্লবী থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন। পল্লবী থানার মামলা নম্বর—৬১।

এর আগে গত ২৬ জুলাই (রোববার) দুপুরে পল্লবীর কালসী পুলিশ বক্সের অদূরে হামলার শিকার হন সার্জেন্ট ফরহাদ। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত জুয়েলকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাপস কুণ্ডু বলেন, পুলিশ পেটানোর ঘটনায় জড়িত জুয়েল রানাসহ অচেনা আরও ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন হামলার শিকার পুলিশ সার্জেন্ট। অভিযুক্তরা ঘটনার পরপরই গা-ঢাকা দিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ভুক্তভোগী পুলিশ সার্জেন্ট জানান, পল্লবী ট্রাফিক জোনে কর্মরত সার্জেন্ট মোঃ আল ফরহাদ গত ২৬ জুলাই সঙ্গীয় কনস্টেবলসহ কালশী রোডের পূর্ব প্রান্ত ক্রসিং এবং আশেপাশের এলাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রনে কাজ করছিলেন। বেলা ১১ টার দিকে কালশী মেইন রোডের পূর্ব প্রান্তের দিকে বসুমতি পরিবহনের একটি বাসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে সার্জেন্ট আল ফরহাদ সঙ্গীয় কনস্টেবলসহ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বাসটি সড়ক থেকে সড়াতে চেষ্টা করছিলেন।

এসময় বাসটির পিছনে কালো জিপ গাড়িতে থাকা যুবলীগ নেতা জুয়েল মোল্লা গাড়ি থেকে নেমেই বাসের ড্রাইভারকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকলে সার্জেন্ট ফরহাদ তাকে গাড়ির পাশ কাটিয়ে যেতে বললে ক্ষেপে যান জুয়েল রানা। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে সার্জেন্ট ফরহাদকে। সাজেন্ট ফরহাদ মুখে মাস্ক পড়ে সুন্দরভাবে কথা বলার অনুরোধ জানালে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে জুয়েল রানা মারধর শুরু করেন ফরহাদকে।

এক পর্যায়ে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা পকেট থেকে পিস্তল বের করে সার্জেন্ট ফরহাদকে হত্যা করতে গেলে ফরহাদ নিজেকে বাচাঁতে দ্রুততার সাথে জুয়েলের হাত চেপে ধরে এবং তার সঙ্গীয় কনস্টেবলসহ আশেপাশে লোকজন জুয়েল রানা ও ফরহাদকে নিরাপদ দুরুত্বে নিয়ে যায়।

এসময় পুলিশ বক্সের সামনে দাঁড়িয়েই জুয়েল রানা মুঠোফোনে তার ক্যাডারদের খবর দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই অজ্ঞাত ৩০ থেকে ৪০ যুবক এসে বক্সের মধ্যেই ফরহাদ ও তার সহকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। ছিনিয়ে নেয় তার বডিঅন সরকারী ক্যামেরা, ছিঁড়ে ফেলেন পরিধেয় পুলিশের পোশাক। খবর পয়ে পল্লবী থানা পুলিশ এগিয়ে এলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। পরে সহকর্মীরা আহত ফরহাদকে ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ঘটনার সত্যতা জানতে অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা জুয়েল রানার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

জুয়েল রানা নামটি রাজধানীর কালশী, কুর্মিটোলা ও বাউনিয়া বাঁধ এবং আশপাশে বসবাসরত এলাকাবাসীর কাছে একটি মূর্তিমান আতঙ্কের নাম! জুয়েল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিহারি ক্যাম্পে নয়জনকে পুড়িয়ে মারা, মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ, জমি দখল ও চাঁদাবাজিসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

পল্লবীর স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছর দশেক আগেও পল্লবী-কালশী এলাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন রিকশাচালক পিতার সন্তান জুয়েল রানা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনটির মিছিল সমাবেশে অংশ নিয়ে নেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

নেতাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজেই খুলে বসেন রিকশার গ্যারেজ। কিছু দিন পর বাগিয়ে নেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ। এরপর বাউনিয়া বাঁধ, পলাশনগর, রূপনগর, বেগুনটিলা ও লালমাটিসহ আশপাশ এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল করে দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। কালশী-বেগুনবাড়ী সংলগ্ন সরকারি জমিতে গড়ে তুলেছেন তিনি রাজু বস্তি। অবৈধভাবেই দিয়েছেন বিদ্যুৎ সংযোগ।

মিরপুর-১১ নম্বরের ‘বি’ ব্লকে ঢাকা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ডুইপ) পৌনে এক কাঠা আয়তনের কমপক্ষে ১৫টি বাড়ি রয়েছে জুয়েল রানা ও তার স্বজনদের দখলে।

বিভিন্ন মামলায় কয়েক দফা জেলে যাওয়া জুয়েল নিজেও মামলায় ফাঁসিয়েছেন বহু মানুষকে। স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির ক্যাডার হিসেবে কাজ করেন জুয়েল। তাই তার বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।

২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে বাঁধের ডি ব্লকের বাউনিয়া বাঁধ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী জামেনা আক্তারকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগে পল্লবী থানায় জুয়েল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে, অপমান ও দুঃখে ওই কিশোরী আত্মহত্যা করলেও বিচার হয়নি জামেনার ধর্ষকদের।

এলাকাবাসীদের দাবি,দ্রুত ও জরুরী ভিত্তিতে জুয়েল রানার মত এমন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় এনে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধুমাত্র স্থানীয় প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যকে পুজি করে বেপোরোয়া হয়ে উঠেছেন যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা। মিরপুরসহ সারাদেশে এরকম জুয়েল রানাদের কারণে আজ আওয়ালীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। এদেরকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করে দলের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা জরুরী হয়ে উঠেছে।

শেয়ার করুন

0 Please Share a Your Opinion.: