Saturday, 11 July 2020

রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা সৌদি আরবে

ফাইভ স্টার হোটেলে’ চাকরির কথা বলে শতাধিক বাংলাদেশী শ্রমিককে সৌদি আরব পাঠানো হলেও তাদের কেউই ওই হোটেল দেখা তো দূরের কথা, অদ্যাবধি কফিলও (নিয়োগকর্তা) খুঁজে পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত কারোর নামে ইকামাও হয়নি। একারণে দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক তার প্রতিনিধির মাধ্যমে একাধিক কোম্পানিতে শ্রমিকদের ‘ছুটা’ কাজ দেয়ার ব্যবস্থা করলেও ওই কোম্পানিগুলো কাউকে ঠিক মতো বেতন পরিশোধ করেনি। বেতন না পাওয়ার কষ্টের কারণে তাদের দিন কাটছে অনাহারে। কেউ কেউ দেশ থেকে ঋণ করে যাওয়া লাখ লাখ টাকা কিভাবে পরিশোধ করবেন সেটি ভেবেই এখন অনেকে দিশেহারা।

প্রতারিত শ্রমিকরা ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি ‘লাব্বাইক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’-এর মালিকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে তারা বলছেন, কফিলের মাধ্যমে ইকামা তৈরি করে চুক্তি মোতাবেক তাদেরকে চাকরির ব্যবস্থা করানোর জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে লাব্বাইক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের স্বত্বাধিকারী আলহাজ জামাল উদ্দিন আহমেদ মোল্লার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে তার প্রতিষ্ঠান থেকে সৌদি আরবে পাঠানো কিছু শ্রমিকের ইকামা না হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, তাদেরকে রিয়াদের যেখানে কাজ দেয়া হয়েছিল, সেখান থেকে তারা অন্যত্র চলে যাওয়ায় সমস্যা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য জায়গায় তাদের কাজের ব্যবস্থা করা হয়। তিনি বলেন, শ্রমিকরা এখন যেখানে ছয়-সাত মাস ধরে কাজ করছে সেখান থেকে জেদ্দার সানাইয়া ফ্রুট প্রসেসিং ফ্যাক্টরিতে ১০ ঘণ্টার ডিউটিতে ১২০০ রিয়াল বেতনে চাকরি দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। ওই ফ্যাক্টরিতে আমার আপন ছোট ভাই আছে; কিন্তু শ্রমিকরা সেখানে যেতে চাচ্ছে না। টালবাহানা করছে। সেখানে গেলে কোম্পানি কাজও দেবে এবং তাদের ইকামাও করে দেবে বলে দাবি করেন তিনি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের ফাইভ স্টার হোটেলের কাজে নয়, রিয়াদের এয়ারপোর্ট ও মার্কেটের কাজে পাঠানো হয়েছিল।’

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে গতকাল শুক্রবার রাতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মনিরুছ সালেহিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোন ধরেননি। পরে তাকে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। সেটির জবাব দেননি তিনি।

গতকাল শুক্রবার প্রতারিত শ্রমিকরা নয়া দিগন্তের কাছে একাধিক ভিডিও ফুটেজ অডিও ও ছবি পাঠিয়ে লাব্বাইক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মালিকের অভিনব প্রতারণার বিষয়ে অভিযোগ করেন। তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, তাদেরকে সৌদি আরবে ফাইভ স্টার হোটেলে হাউজকিপিং অথবা মার্কেট ক্লিনারের কাজ দেয়ার কথা বলে আনা হয়েছিল। এরমধ্যে কারো এক বছর আবার ১৪-১৫ মাস সময় চলে গেছে। এখনো কাউকে চুক্তি মোতাবেক লাব্বাইক রিক্রুটিং এজেন্সি কাজ দিতে পারেনি। উল্টো তাদের কাউকে কাউকে মক্কা, মদিনা, রিয়াদসহ বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে মাসের পর মাস বেকার বসিয়ে রেখেছে। ছুটা কাজ করিয়েছে; কিন্তু বেতন মেলেনি। এ অবস্থায় তারা লাব্বাইক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মালিকের সাথে দফায় দফায় যোগাযোগ করলেও তিনি তাদের কাছ থেকে শুধু সময় নিচ্ছেন; কিন্তু কোনো সমাধান করছেন না। এভাবেই কেটে গেছে দেড় বছর।

গতকাল ফেনী সোনাগাজী মালেকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মো: সিরাজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি ঢাকার ফকিরাপুল বক্সকালভার্ট রোডের হাজী রহিমউল্লাহ সাহেবের অফিসের জনৈক নুরুল করিমের মাধ্যমে সৌদি আরবে এসেছি ২০১৯ সালের ২২ জুন। আমার সাথে আরো শতাধিক শ্রমিক বর্তমানে জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মামসহ বিভিন্ন এলাকায় এসে বেকার থেকে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাকে রিয়াদের রয়েল গ্যালারি নামক মলে প্রথমে মাত্র ১৫ দিনের জন্য কাজ দিয়েছিল। এ সময় একটি টাকাও পাইনি। সেখান থেকে আমাকেসহ প্রায় ৫০ জনকে গুবাইরা নামক জায়গার একটি বাড়িতে তিন মাস বসাইয়া রাখে।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাকে ফাইভ স্টার হোটেলে হাউজকিপিং অথবা মার্কেট ক্লিনারের কাজ দেয়ার কথা বলে আনলেও আজ পর্যন্ত সেই হোটেল আমি চোখেও দেখেনি। আমরা লাব্বাইক ট্রাভেলসের মালিকের হাতে প্রতারণার শিকার হয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে গেছি।

মক্কা জাবালে নূরের পাশে ইশারা আদিল এলাকায় বর্তমানে মানবেতর জীবন কাটানো ২৩ জন শ্রমিকের মধ্যে ভোলার বাসিন্দা মো: বিল্লাল ও বাঞ্ছারামপুরের বাসিন্দা দুলাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা লাব্বাইক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মাধ্যমে চার লাখ টাকা খরচ করে এসেছি; কিন্তু আসার পর থেকে এ পর্যন্ত শুধুই প্রতারিত হয়েছি। কাজ নেই। ইকামা নেই। বাড়িতে পরিবার কষ্টে আছে। ধারদেনা করে এসেছি। এখন কী হবে ভেবে পাচ্ছি না। না হলে দেশে ফেরত নিয়ে যাক।

ফেনীর সিরাজসহ অন্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আপনারা রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জামালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন আর আমাদেরকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। কারণ আমরা এখানে জমিজমা বিক্রি করে এসেছি। আমরা ঋণগ্রস্ত। কী করব বুঝতে পাচ্ছিনা। লাব্বাইক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মাধ্যমে ১০০ জনের বেশি শ্রমিক আসছে। যদিও লাব্বাইক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মালিক জামাল উদ্দিন আহমেদ মোল্লা দাবি করছেন, তার প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৬০ জন শ্রমিক সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন শ্রমিক বর্তমানে সমস্যায় আছেন। সেটিও সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।


শেয়ার করুন

0 Please Share a Your Opinion.: